শনিবার ১৩ জুন ২০২৬
Online Edition

সীমান্তে একের পর এক উস্কানি দিচ্ছে ভারত

 

নাছির উদ্দিন শোয়েব: স্বাধীনতার তেপ্পান্ন বছর পরও প্রতিবেশি দেশ ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের সীমান্তে দুই বাহিনীর সম্পর্কের উন্নতি হয়নি। যে দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক থাকার কথা; কিন্তু বাস্তবে এর চিত্র বিপরীত। কিছু দিন পর পরই দেশের বিভিন্ন সীমান্তে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) বাংলদেশি নাগরিকদের ওপর চড়াও হচ্ছে। আইনের তোয়াক্কা না করে বিভিন্ন সময় পাখির মতো গুলী করে নিরীহ বাংলদেশিদেরকে হত্যা করছে। আটক করে নিয়ে নির্যাতন চালানোর ঘটনা ঘটছে। বিনা দোষে কৃষকের জমি থেকে বাংলদেশিদের তুলে নিয়ে মিথ্যা মামলা দিয়ে ভারতের কারাগারে আটক করে রাখছে। এছাড়াও ভারতীয় উপজাতি সম্প্রদায় খাসিয়াদেরকেও লেলিয়ে দেয়া হচ্ছে সীমান্তবর্তী বাংলাদেশী নাগরিকদের ওপর। 

সম্প্রতি চাপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জ উপজেলার চৌকা ও কিরণগঞ্জ সীমান্তে জোরপূর্বক কাঁটাতারের বেড়া দেয়ার চেষ্টা চালায় বিএসএফ। বাংলাদেশী কৃষকের জমিতে ঢুকে ফসল নষ্ট ও গাছ কেটে নেয়ার ঘটনায় চরম উত্তেজনা দেখা দেয়। এসব ঘটনায় দুই দেশের নাগরিক ও দুই দেশের বাহিনীর মধ্যে ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার ঘটনা ঘটে এবং এসব ঘটনায় পাঁচ বাংলাদেশী আহত হয়। এসব ঘটনার রেষ না কাটতেই  বাংলাদেশ সীমান্তে ‘অপস অ্যালার্ট’ মহড়া শুরু করেছে বিএসএফ। এদিকে গতকাল শুক্রবার বান্দরবান সীমান্তে স্থলমাইন বিস্ফোরণে দুই বাংলাদেশী আহত হয়েছে।  অন্যদিকে দিনাজপুরে কৃষককে ধরে নিয়ে যায় বিএসএফ, যদিও পরে তাকে ছেড়ে দেয়া হয়।  

বাংলাদেশ-ভারত সীমান্তে ১০ দিনের ‘অপস অ্যালার্ট’ মহড়া শুরু করেছে ভারতের সীমান্ত নিরাপত্তা বাহিনী (বিএসএফ)। বেশ কয়েক দিন ধরেই সীমান্তে ভারতের কাঁটাতারের বেড়া দেয়া নিয়ে ঢাকা-দিল্লীর মধ্যে উত্তেজনা চলছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যে সীমান্তে এই মহড়া শুরু করলো তারা। গত ২২ জানুয়ারি থেকে শুরু হওয়া ওই মহড়া চলবে à§©à§§ জানুযারি পর্যন্ত। বিএসএফ কর্তৃক প্রকাশিত এক বিজ্ঞপ্তির উদ্ধৃতি দিয়ে এ খবর দিয়েছে ভারতের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা এএনআই। ভারতের প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন উপলক্ষে সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করার লক্ষ্যেই এই মহড়া শুরু হয়েছে বলে দাবি ভারত সরকারের। বিএসএফের বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের পরিবর্তিত পরিস্থিতি বিবেচনা করে ৭৬তম প্রজাতন্ত্র দিবসের আগে এই পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। নিরাপত্তা বৃদ্ধির লক্ষ্যে বাংলাদেশ-ভারতের দীর্ঘ ৪ হাজার ৯৬ কিলোমিটার সীমান্তের সকল ফিল্ড ফর্মেশনে ওই সতর্কতা মহড়া শুরু করেছে বিএসএফ। এর মাধ্যমে সীমান্ত ফাঁড়িগুলোকে জোরালো করছে তারা। এই মহড়ার সময় দুই দেশের সীমান্তে টহল এবং অন্যান্য দায়িত্ব জোরদার করা হবে। এ সময় বিএসএফের অতিরিক্ত মহাপরিচালক (পূর্বাঞ্চল) ও অন্যান্য কর্মকর্তারা পূর্বাঞ্চলীয় কমান্ড এলাকার দিন-রাতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেছেন। দক্ষিণবঙ্গ সীমান্তে বিএসএফের অপারেশনাল প্রস্তুতি এবং কৌশলগত মোতায়েন তদারকি করতে অতিরিক্ত মহাপরিচালক (এডিজি) রবি গান্ধী সীমান্ত এলাকা পরিদর্শন করেছেন। তিনি সকল ফিল্ড ফর্মেশনকে বিশেষভাবে নদী সীমান্ত এবং যেখানে কাঁটাতারের বেড়া নেই সে সব এলাকায় নিরাপত্তা আরও জোরদার করার নির্দেশ দিয়েছেন। এছাড়া ‘অপস অ্যালার্ট’ মহড়ার সময় সীমান্তে বিএসএফ'র সেনারা গভীর পর্যবেক্ষণীয় মহড়া পরিচলনা করবে বলে উল্লেখ করা হয়েছে ওই বিজ্ঞপ্তিতে। ২০২৫ সালের ২৬ জানুয়ারি ভারত ৭৬তম প্রজাতন্ত্র দিবস উদযাপন করবে। ১৯৫০ সালের এই দিনে ভারত সংবিধান কার্যকর করে একটি সার্বভৌম গণতান্ত্রিক প্রজাতন্ত্রে পরিণত হয়। প্রতি বছর এই দিনটি জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক আয়োজনে উদযাপিত হয়। তবে প্রজাতন্ত্র দিবস উপলক্ষে বাংলাদেশ সীমান্তে এধরনের বড় মহড়া এবারই প্রথম। 

ধাওয়া খেয়ে পালায় বিএসএফ: সম্প্রতি চাঁপাইনবাবগঞ্জে ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তে দুই দেশের কয়েক হাজার মানুষের উপস্থিতি এবং মুখোমুখী অবস্থান, ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়া সীমান্ত উত্তেজনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে। সীমান্তে বিএসএফের বেড়া দেয়ার চেষ্টা করার দুই সপ্তাহের মধ্যে একই সীমান্তে উত্তেজিত জনতার বিপুল উপস্থিতি এবং আক্রমণাত্মক অবস্থান উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। স্থানীয়দের কাছ থেকে খবর নিয়ে জানা যায়, স্থানীয় মানুষের মধ্যেও উদ্বেগ ও আতঙ্ক রয়েছে। সীমান্ত এলাকার পরিস্থিতি স্বাভাবিক থাকলেও যেকোনো সময় পরিস্থিতি উত্তপ্ত হতে পারে এমন আশঙ্কা পুরোপুরি কাটেনি। চলতি বছরের শুরু থেকেই সীমান্তের বিভিন্ন জায়গায় বিএসএফ এর কাঁটাতারের বেড়া দেয়াকে কেন্দ্র করে উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি ভারত বাংলাদেশের রাজনীতিতেও ইস্যু হচ্ছে। সীমান্ত নিয়ে উদ্বেগের কারণ ১৮ই জানুয়ারি ভারত বাংলাদেশ সীমান্তে উভয় দেশের কয়েক হাজার মানুষ উপস্থিত হয়ে ধাওয়া-পাল্টা ধাওয়ায় অংশ নেয়। বিজিবির হিসেবে বাংলাদেশ অংশে ১০-à§§à§« হাজার মানুষ সীমান্তে উপস্থিত হয় সেদিন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করতে এবং উত্তেজিত জনতা ছত্রভঙ্গ করতে বিএসএফ এর কয়েক রাউন্ড টিয়ার শেল ছুঁড়তে হয়। স্থানীয়রা বলছেন, সেখানে সাউন্ড গ্রেনেড বিস্ফোরণ ঘটায় বিএসএফ। দুই দেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর তৎপরতায় শেষ পর্যন্ত বড় ধরনের কোনো দুর্ঘটনা ছাড়াই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আসে। চাঁপাইনবাবগঞ্জ-মালদহ সীমান্তে দুই দেশের জনগণের মধ্যে এরকম অবস্থান ধাওয়া পাল্টা-ধাওয়ার ঘটনা আগে কখনোই ঘটেনি। বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী গ্রামবাসীরা বলছেন, প্রয়োজন হলে আবার তারা সীমান্তে যাবেন এবং লড়তে প্রস্তুত আছেন। ঘটনার পর দুই দেশের সীমান্তে সাধারণ মানুষের গতিবিধি নিয়ন্ত্রণে কঠোর হয়েছে সীমান্তরক্ষায় নিয়োজিত বিজিবি এবং বিএসএফ। দুই সীমান্তে নজরদারি এবং টহল বেড়েছে। গত এক সপ্তাহে দফায় দফায় গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে বাংলাদেশের বর্ডার গার্ড। দুদেশের সীমান্তরক্ষী বাহিনীর উচ্চ পর্যায়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে পতাকা বৈঠকও হয়েছে। সীমান্তে উপস্থিত দুই দেশের জনগণের মধ্যেই ক্ষোভ দেখা গেছে। অনেকেই দেশীয় অস্ত্র লাঠি-সোঁটা, কাস্তে নিয়ে সেখানে উপস্থিত হয়েছিলেন। বাংলাদেশী নাগরিকরা অভিযোগ করেন, তাদের দিকে তীর ও পাথর নিক্ষেপ করা হয়। 

দুই বাংলাদেশী আহত: বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ি সীমান্তে পৃথক দুই স্থলমাইন বিস্ফোরণে দুই বাংলাদেশী যুবক আহত হয়েছেন। গতকাল শুক্রবার ভোর সাড়ে ৬টায় উপজেলার ফুলতলী সীমান্তের ৪৭-৪৮ ও ৪৯ নম্বর পিলার এলাকায় এ বিস্ফোরণের ঘটনা ঘটে। আহত ব্যক্তিরা হলেন-নাইক্ষ্যংছড়ি উপজেলার আশারতলী এলাকার মো. হোসেনের ছেলে আলী হোসেন (৩৪) ও লেমুতলী এলাকার স্থানীয় বাসিন্দা জাফর আলমের ছেলে আরিফ উল্লাহ (২৮)। স্থানীয়রা জানান, বিস্ফোরণে আহত দুজনই মিয়ানমারের অভ্যন্তরে অবৈধভাবে প্রবেশ করে গরু আনতে গিয়েছিলেন। ভোর সাড়ে ৬টার দিকে ৪৭-৪৮ নম্বর সীমান্ত পিলার এলাকায় পুঁতে রাখা মাইন বিস্ফোরণে আলী হোসেনের বাম পায়ের গোড়ালি বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। অন্যদিকে সকাল ১০টার দিকে ৪৯ নম্বর সীমান্ত পিলার এলাকায় আরেকটি স্থলমাইন বিস্ফোরণের কবলে পড়েন আরিফ উল্লাহ। এতে তার মুখম-ল ঝলসে যায়। খবর পেয়ে স্থানীয়রা আহতদের উদ্ধার করে কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠান। নাইক্ষ্যংছড়ি সদর ইউনিয়নের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সাবেক সদস্য শামসুল আলম ও নাইক্ষ্যংছড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মাসরুরুল হক ঘটনার সত্যতা নিশ্চিত করেছেন। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মুহাম্মদ মাজহারুল ইসলাম চৌধুরী জানান, আহতদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। 

কৃষককে ধরে নিয়ে যায় বিএসএফ: দিনাজপুরের বিরল উপজেলার এনায়েতপুর সীমান্ত থেকে আলামিন নামের এক কৃষককে ধরে নিয়ে যাওয়ার পর পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে ছেড়ে দিয়েছে বিএসএফ। গতকাল শুক্রবার সকালে ৮ নম্বর ধর্মপুর ইউনিয়নের এনায়েতপুর দ্বীপনগর গ্রামে সীমান্তের শূন্যরেখার ৩২৩ নম্বর পিলারের পাশে নিজ জমিতে কাজ করার সময় তাকে ধরে নিয়ে যায় বিএসএফ। পরে বিকেলে তাকে ছেড়ে দেওয়া হয়। কৃষক আলামিন উপজেলার ধর্মপুর ইউনিয়নের দ্বীপনগর গ্রামের আইজ উদ্দিনের ছেলে। স্থানীয়রা জানান, সকালে সীমান্তের শূন্যরেখার ৩২৩ নম্বর পিলারের পাশে আলামিন নিজ জমিতে কাজ করছিলেন। এসময় বিএসএফ এসে তাকে ধরে ক্যাম্পে নিয়ে যায়। পরে তার পরিবারের লোকজন বিজিবি সদস্যদের বিষয়টি জানান। দিনাজপুর ৪২ বিজিবি ব্যাটালিয়নের অধিনায়ক লেফটেন্যান্ট কর্নেল আহসান-উল ইসলাম ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বিএসএফকে পতাকা বৈঠকের আহ্বান জানান। পরে বিকেলে পতাকা বৈঠকের মাধ্যমে আলামিনকে ছেড়ে দেয় বিএসএফ। লেফটেন্যান্ট কর্নেল আহসান-উল ইসলাম যুবক আলামিনকে ছেড়ে দেওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন।

অনলাইন আপডেট

আর্কাইভ